যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার (SRHR) বিষয়ক সংলাপ এবং কার্যক্রমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত হয়েছে “Ensure Active Participation of Marginalized Groups in Health and SRHR Dialogue and Actions – 01” শীর্ষক একটি আলোচনা সভা। মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকাল ১০:৩০ মিনিটে UYP (Unlocking Youth Potential) – ময়মনসিংহ ইউনিটের উদ্যোগে ইউওয়াইপি ময়মনসিংহ কেন্দ্রে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে অতিথিদের ফুলেল শুভেচ্ছার মাধ্যমে বরণ করে নেওয়া হয় এবং অংশগ্রহণকারীদের পরিচয়পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিটি সঞ্চালনা করেন ইউওয়াইপি’র যুব কর্মকর্তা মোঃ এরশাদ মিয়া এবং সভাপতিত্ব করেন প্রকল্প কর্মকর্তা রেসমিনা হক।
আলোচনা সভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আল ফালাহ্ বাংলাদেশের কমিউনিটি মোবিলাইজার নেসার আহমেদ এবং আশীর্বাদ মহিলা সমিতির প্রতিনিধি শান্তি রামবাড়ী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তর, ময়মনসিংহ বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা। এছাড়াও অনুষ্ঠানে হরিজন, রবিদাস এবং বিহারি সম্প্রদায়ের সদস্য, যুব প্রতিনিধি, ইয়ুথ এডভোকেট ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অংশগ্রহণকারীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে হরিজন, রবিদাস এবং বিহারি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, বর্তমান সামাজিক অবস্থান, বৈষম্য, অধিকার এবং স্বাস্থ্য ও এসআরএইচআর সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই জনগোষ্ঠীগুলো সামাজিক বঞ্চনা, বৈষম্য ও সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক মর্যাদা অর্জনের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। ফলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তাদের উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
আলোচনায় মারজিয়া আক্তার বাংলাদেশের বিহারি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সামাজিক বাস্তবতা এবং বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিহারি জনগোষ্ঠী বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে জীবনযাপন করলেও তাদের উন্নয়ন ও অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আরও কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যদিকে মণিষা দাস রবিদাস সম্প্রদায়ের ইতিহাস, সামাজিক অবস্থান এবং চলমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, মূলধারার সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই এই জনগোষ্ঠী মৌলিক অধিকার ও প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আলোচনা সভার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টিগত অবস্থা বিষয়ক জরিপের ফলাফল উপস্থাপন। অনুষ্ঠানের পূর্বে ইউওয়াইপি’র ইয়ুথ এডভোকেট ও মেন্টররা হরিজন পল্লী, বিহারি ক্যাম্প এবং রবিদাস পাড়ায় সাত দিনব্যাপী একটি জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। জরিপে তিনটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টিগত অবস্থা এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত আচরণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
জরিপের সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন ইউওয়াইপি’র মেন্টর ফারজানা। তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি সংক্রান্ত সমস্যার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি সচেতনতার ঘাটতিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করছে। জরিপে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে মাছ ও মাংস গ্রহণের অভ্যাস থাকলেও দুধ ও ডিম খাওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। একইসঙ্গে খাদ্যতালিকায় মৌসুমি ফল এবং পর্যাপ্ত শাকসবজির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কম লক্ষ্য করা গেছে। জরিপে আরও উঠে আসে যে, কমিউনিটির অনেক কিশোর-কিশোরী সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার কারণে নিয়মিত সকালের খাবার গ্রহণ করে না, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত চা পানের প্রবণতাও উদ্বেগজনকভাবে লক্ষ্য করা গেছে। বক্তারা এসব বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগ জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা স্বাস্থ্য ও এসআরএইচআর বিষয়ক সেবা গ্রহণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা, সামাজিক বৈষম্য, তথ্য ও সচেতনতার ঘাটতির বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তারা বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পায় না এবং সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্যের কারণে সেবাপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হয়। তাই স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করতে অংশগ্রহণমূলক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।
বিশেষ অতিথি মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা তাঁর বক্তব্যে বলেন, “একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক সমাজ গঠনের জন্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে তাদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি।” তিনি আরও বলেন, “সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচির সুফল যেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষও সমানভাবে ভোগ করতে পারে, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলকে গুরুত্ব দিতে হবে।”
সভাপতির বক্তব্যে রেসমিনা হক বলেন, “সমাজের সকল স্তরের মানুষের সমান অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য ও এসআরএইচআর বিষয়ক সংলাপ, পরিকল্পনা এবং কর্মসূচিতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “সামাজিক বৈষম্য দূর করে অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে একটি অধিক মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।”
বক্তারা আরও উল্লেখ করেন যে, স্বাস্থ্য ও এসআরএইচআর বিষয়ক নীতি, পরিকল্পনা এবং কার্যক্রম প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে তাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, বৈষম্য দূরীকরণ এবং সামাজিক ক্ষমতায়নের উদ্যোগ জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
পরিশেষে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা এবং স্বাস্থ্যসেবায় সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা আশা প্রকাশ করেন যে, এ ধরনের উদ্যোগ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করবে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বাস্থ্যসম্মত সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।







